বুরকিনা ফাসো’র ইব্রাহিম ট্রাওরে আফ্রিকার এক নতুন আশার নাম

পশ্চিম আফ্রিকান দেশ বুরকিনা ফাসোর ৩৭ বছর বয়সি ক্যারিশমাটিক নেতা ক্যাপ্টেন ইব্রাহিম ট্রাওরে গত কয়েক বছরে সমগ্র আফ্রিকার নেতা হিসেবে নিজের ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা করেছেন।

ইব্রাহিম ট্রাওরে সমগ্র আফ্রিকার নেতা হিসেবে নিজের ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছেন | ছবি: সংগৃহীত

“প্রতিবার সাম্রাজ্যবাদীদের ছড়ির ইশারায় আর পুতুলের মতো নাচবো না!”—এই এক বাক্যে আফ্রিকান তরুণদের চোখে বীর হয়ে উঠলেন বুরকিনা ফাসোর সেনা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইব্রাহিম ট্রাওরে। মাত্র ৩৭ বছর বয়সে পশ্চিম আফ্রিকার ছোট দেশ বুরকিনা ফাসোর সীমা পেরিয়ে সারা আফ্রিকাজুড়ে তার নাম এক আন্দোলনের, এক চিন্তার, এক আশার প্রতীক হয়ে উঠেছে। পশ্চিম আফ্রিকান দেশ বুরকিনা ফাসোর ৩৭ বছর বয়সি ক্যারিশমাটিক নেতা ক্যাপ্টেন ইব্রাহিম ট্রাওরে গত কয়েক বছরে সমগ্র আফ্রিকার নেতা হিসেবে নিজের ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা করেছেন। তার দেশসহ ওই অঞ্চলের বেশকিছু দেশের মানুষের মধ্যে নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন। পশ্চিম আফ্রিকার দেশ বুরকিনা ফাসোকে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ ও নব্য-উপনিবেশবাদের ধারণা থেকে মুক্ত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এই সেনাশাসক।

কে এই ইব্রাহিম ট্রাওরে?

ইব্রাহিম ট্রাওরে ১৯৮৮ সালের জুলাইয়ে বুরকিনা ফাসোর ছোট একটি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ক্যাডেট হিসেবে সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে দ্রুতই তিনি নিজের নেতৃত্বগুণ ও সাহসিকতার জন্য খ্যাতি অর্জন করেন। ২০২২ সালে দেশটিতে ঘটে এক সামরিক অভ্যুত্থান, যেখানে ৩৫ বছর বয়সী ট্রাওরে ছিলেন মূল নেতৃত্বদানকারী সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে। এর ফলে তিনি বুরকিনা ফাসোর অন্তর্বর্তীকালীন রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন। বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ রাষ্ট্রপ্রধানদের একজন হিসেবে তার ভূমিকাও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে।

আফ্রিকার প্রেক্ষাপট: কেন তরুণদের জন্য ট্রাওরে অনুপ্রেরণা?

বুরকিনা ফাসো সহ পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকার অনেক দেশ আজও ঔপনিবেশবাদ ও সাম্প্রতিক উপনিবেশবাদের ছায়ায় ভুগছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্নীতি, সন্ত্রাসবাদের প্রকোপ এবং অর্থনৈতিক সংকট দেশের তরুণদের জন্য জীবনের স্বপ্ন প্রায় অকল্পনীয় করে তুলেছে। এই তরুণদের জন্য নতুন নেতৃত্ব প্রয়োজন ছিল, যিনি শুধু রাজনীতি নয়, তাদের আশা-স্বপ্ন ও ভাষা বুঝতে পারেন। ক্যাপ্টেন ট্রাওরে সেই ভূমিকা নিয়েছেন। আন্তর্জাতিক কনসালটেন্সি ফার্ম কন্ট্রোল রিস্কস এর সিনিয়র গবেষক বেভারলি ওচিয়েং বলছেন, ‘ট্রাওরের প্রভাব ব্যাপক। আমি কেনিয়ার রাজনীতিবিদ আর লেখকদের বলতে শুনেছি যে তারা বলছেন, “আমরা এতদিন পর কাঙ্ক্ষিত নেতা পেয়েছি। ”’

২০২৩ সালের রাশিয়া-আফ্রিকা সামিট: ভাষণের রূপকার

২০২৩ সালের জুলাইয়ে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে অনুষ্ঠিত আফ্রিকা-রাশিয়া সামিটে ইব্রাহিম ট্রাওরের দেওয়া ভাষণ দ্রুত সোশ্যাল মিডিয়া এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ভাইরাল হয়। সেখানে তিনি বলেন, ‘আমরা আর পুতুল নই, আমরা নিজেদের সিদ্ধান্ত নিতে পারি। সাম্রাজ্যবাদীদের ছড়ির ইশারায় নাচার সময় শেষ। আফ্রিকা তার সম্পদের মালিক। আমরা স্বাধীন হতে চাই, আমরা মুক্ত হতে চাই।’
এছাড়াও তিনি সরাসরি ফ্রান্সসহ পশ্চিমা শক্তিগুলোকে লক্ষ্য করে বলেন, ‘তারা আমাদের ইতিহাস চুরি করেছে, আমাদের সম্পদ লুট করেছে এবং আজও আমাদের স্বাধীনতাকে বাঁধা দিতে চায়।’ এই বক্তব্য আফ্রিকার তরুণদের মধ্যে গভীর সাড়া ফেলে, যাদের অনেকেই নিজেদের ইতিহাস ও অস্তিত্ব নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছিলেন। তার ওই বক্তব্য সেসময় রাশিয়ার গণমাধ্যমে ফলাওভাবে প্রচার করা হয়েছিল। ট্রাওরেকে পুরো আফ্রিকার নেতা হিসেবে তুলে ধরতে ওই প্রচারণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

বুরকিনা ফাসোর স্বর্ণখনি জাতীয়করণ

বুরকিনা ফাসো ছিল আফ্রিকার অন্যতম স্বর্ণ উৎপাদনকারী দেশ। দীর্ঘদিন ধরে এই স্বর্ণখনিগুলো মূলত বিদেশি কোম্পানির মালিকানায় ছিল। ট্রাওরের নেতৃত্বে দেশটি শুরু করে এসব খনি জাতীয়করণের প্রক্রিয়া, যা অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরতার পথে বড় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়। তিনি বলেছিলেন, “আমাদের সম্পদ আমাদের নিজেদের। আফ্রিকানদের জন্য এই সম্পদ থেকে লাভ আসা উচিত।” এই উদ্যোগকে অনেক বিশ্লেষক ‘নিও-কলোনিয়ালিজম’ বিরোধী লড়াইয়ের অংশ হিসেবে দেখেন, যেখানে আফ্রিকা তার নিজস্ব সম্পদ ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা ফিরে পেতে চায়। সেনা অভ্যুত্থানে ২০২২ সালে ক্ষমতা গ্রহণ করার পর ট্রাওরের সরকার সাবেক ঔপনিবেশিক শক্তি ফ্রান্সের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক দৃঢ় করেছে। বুরকিনা ফাসোতে বামপন্থী অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়ন ও রাশিয়ার প্যারা মিলিটারি ব্রিগেড মোতায়েনের মত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তা অনেকটা পরিষ্কার হয়। বিপুল পরিমাণ খনিজ সম্পদ সমৃদ্ধ বুরকিনা ফাসোর বেশ কয়েকটি স্বর্ণের খনি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাত থেকে রাষ্ট্রীয় মালিকানার অধীনে নিয়ে এসেছেন ট্রাওরের সেনা সরকার। গত এপ্রিল মাসে তারা ঘোষণা দিয়েছে যে, বিদেশি মালিকানাধীন আরও খনি রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নিয়ে আসার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।

বিতর্ক ও সমালোচনা

যদিও ট্রাওরে তরুণ ও সাহসী নেতা হিসেবে জনপ্রিয়, তার শাসনব্যবস্থা নিয়ে অনেক সমালোচনা রয়েছে। ইসলামি বিচ্ছিন্নতাবাদ দমনে তার প্রশাসন ততটা সফল নয়, বরং প্রতিবেশী দেশেও সন্ত্রাসবাদ ছড়িয়ে পড়েছে। ট্রাওরে ক্ষমতায় এসে সন্ত্রাসবাদ দমনের প্রতিশ্রুতি রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন। বুরকিনা ফাসোতে গত ১০ বছর ধরে চলা ইসলামি বিচ্ছিন্নতাবাদী কার্যক্রম এখন পার্শ্ববর্তী শান্তিপূর্ণ দেশ বেনিনেও ছড়িয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে সাংবাদিক, বিরোধী নেতাদের বিরুদ্ধে দমন-পীড়নের অভিযোগ উঠেছে। অনেক বিশ্লেষক তার সরকারকে ‘সামরিক কর্তৃত্ববাদী’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

আফ্রিকার রাজনীতির নতুন দিগন্ত

বিশ্লেষক কুয়েসি আনিং মনে করেন, আফ্রিকার রাজনীতিতে অনেক বছর ধরে যে পুরনো নেতারা ক্ষমতা আঁকড়ে রেখেছেন, সেখানে ট্রাওরে ব্যতিক্রম। তিনি একটি নতুন পথ দেখাচ্ছেন। তবে ইতিহাসের দৃষ্টিতে অনেক আফ্রিকান বিপ্লবী নেতা যেমন থমাস সাঙ্কারা নিজ আদর্শ বিসর্জন দিয়েছেন, ট্রাওরের ভবিষ্যৎ এখনও অনিশ্চিত। তবে গবেষক এনোখ র্যান্ডি আইকিন্স বলেন, যদি ট্রাওরে শাসনব্যবস্থাকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক না করেন এবং সুশাসনের ওপর জোর দেন, তবে ইতিহাস তাকে আফ্রিকার সর্বকালের সেরা নেতাদের একজন হিসেবে মনে রাখবে।

ক্যাপ্টেন ইব্রাহিম ট্রাওরে আজ কেবল বুরকিনা ফাসোর প্রেসিডেন্ট নন, তিনি আফ্রিকার আত্মনির্ভরতা, তরুণদের আশা এবং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার এক প্রতীক। তাঁর ভাষণ ও কর্ম শুধু বুরকিনা ফাসো নয়, গোটা আফ্রিকায় পরিবর্তনের বাতাস বইয়ে দিচ্ছে। যদি তিনি সত্যিই জনগণের পাশে থাকেন, তবে ইতিহাস তাকে স্মরণ করবে কেবল সেনা অফিসার হিসেবেই নয়, বরং এক নিরব বিপ্লবের সূচনা হিসেবে।

এ সম্পর্কিত আরও