ব্যাচেলরবিদ্বেষী বাড়ির মালিকরা কি স্বামী-স্ত্রীর ভুয়া পরিচয়ে বাসা ভাড়া নেওয়ার প্রবণতা বাড়াচ্ছেন?
বাড়িওয়ালাদের ব্যাচেলরবিদ্বেষী মনোভাব এবং স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ের প্রতি তুলনামূলক বেশি আস্থার সুযোগ নিচ্ছে অসাধু মানুষ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত, নিরাপদ ভাড়াটিয়া মানেই বিবাহিত ভাড়াটিয়া নয়; আর ব্যাচেলর মানেই অনিরাপদ ভাড়াটিয়াও নয়।
আপনি ব্যাচেলর এবং ভাড়া নেওয়ার মতো একটি বাসা খুঁজছেন। আপনার গল্প না শুনেও বলা যায়, এ ব্যাপারে আপনার অভিজ্ঞতা খুব একটা সুখকর নয়। বিশেষ করে ঢাকা শহরে একজন ব্যাচেলর হিসেবে বাসা খুঁজতে গেলে শুরুতেই আপনাকে বুঝিয়ে দেওয়া হবে, এই শহরে থাকার অধিকার থাকলেও পছন্দের বাসায় থাকার অধিকার আপনার নেই।
রাস্তাঘাটে, দেয়ালে, বাড়ির সামনে কিংবা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে অসংখ্য ‘টু-লেট’ বিজ্ঞাপন চোখে পড়বে। প্রথমে মনে হতে পারে, এত বিজ্ঞাপন যখন আছে, নিশ্চয়ই একটা বাসা পাওয়া যাবে। কিন্তু একটু খেয়াল করলেই দেখা যায় বিজ্ঞাপনের শর্ত ‘শুধুমাত্র ফ্যামিলি’, ‘চাকরিজীবী স্বামী-স্ত্রী’, ‘কর্মজীবী মহিলা বা ছাত্রী’, ‘ব্যাচেলর প্রযোজ্য নয়’ ইত্যাদি। কেউ কেউ আবার আরও এক ধাপ এগিয়ে শর্ত জুড়ে দেন,‘ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হলে ব্যাচেলরও চলবে’। অর্থাৎ সমস্যা আপনি ব্যাচেলর কি না, তা নয়; সমস্যা হচ্ছে, আপনি কোন ধরনের ব্যাচেলর!
ঢাকা শহরে এমন অনেক মানুষও আছেন, যারা নিজের থাকার জন্য দুই রুমের একটি বাসা ভাড়া নিয়ে এক রুমে নিজে থাকেন এবং অন্য রুমটি সাবলেট দেন। সেখানেও ভাড়াটিয়া বাছাইয়ের ক্ষেত্রে এক ধরনের অদৃশ্য পছন্দ কাজ করতে দেখা যায়। অনেকেই এমন ভাড়াটিয়া চান, যিনি দিনের বেশিরভাগ সময় বাইরে থাকবেন, রাতে বাসায় ফিরবেন, ঘুমাবেন এবং সকালে আবার কাজে চলে যাবেন। এ ধরনের ক্ষেত্রে চাকরিজীবী স্বামী-স্ত্রী কিংবা কর্মজীবী নারীকে তুলনামূলকভাবে বেশি পছন্দ করার প্রবণতা দেখা যায়।
ব্যাচেলর হলেই কি সে খারাপ?
ঢাকার অনেক বাড়িওয়ালার কাছে ‘ব্যাচেলর’ শব্দটি যেন একটি চরিত্রের সনদ। ব্যাচেলর মানেই হৈচৈ করবে, বাড়িতে মানুষজন আসবে, রাত করে ফিরবে, ভাড়া দেবে না, বাড়ির পরিবেশ নষ্ট করবে—এমন একটি পূর্বধারণা অনেকের মধ্যে রয়েছে।
বাস্তবে অবশ্যই সব ব্যাচেলর ভালো ভাড়াটিয়া নন। যেমন সব পরিবারও ভালো ভাড়াটিয়া নয়। ভাড়া বাকি রাখা, বাড়ির ক্ষতি করা, প্রতিবেশীদের বিরক্ত করা কিংবা চুক্তির শর্ত না মানা—এসব সমস্যা ব্যাচেলর বা ফ্যামিলি যে কোনো ধরনের ভাড়াটিয়ার ক্ষেত্রেই হতে পারে। তাহলে একজন মানুষ ব্যাচেলর—এই একটি পরিচয় কেন তার বিরুদ্ধে আগাম রায় হয়ে যাবে?
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঢাকার আবাসনসংক্রান্ত আলোচনাতেও বিষয়টি বারবার উঠে এসেছে। সংবাদমাধ্যমে ব্যাচেলরদের ‘Family Only’ শর্তের কারণে বাসা খুঁজতে গিয়ে হয়রানি এবং তুলনামূলক বেশি ভাড়ার অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে। অর্থাৎ সমস্যাটি নিছক একজনের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নয়; এটি নগরজীবনের একটি বাস্তব সামাজিক সমস্যা।
ব্যাচেলরদের জন্য তাহলে কোন বাসা?
তিন তলার দুই রুমের ভালো একটি ফ্ল্যাট হয়তো ‘ফ্যামিলি’র জন্য। একই ভবনের দুই তলার ফ্ল্যাটটি ‘ফ্যামিলি’র জন্য। তার পাশের ফ্লাটটিও ‘ফ্যামিলি’র জন্য। আর ব্যাচেলরদের জন্য? ছাদে একটি ছোট ঘর। চিলেকোঠা। নিচতলায় গ্যারেজের পাশে একটি কক্ষ। অথবা সাত-আট তলার এমন একটি বাসা, যেখানে লিফট নেই। অর্থাৎ হয় আকাশের কাছাকাছি, নয়তো মাটির সঙ্গে প্রায় মিশে থাকা। আলো-বাতাস কম, পুরোনো ভবন, স্যাঁতসেঁতে দেয়াল, সংকীর্ণ জায়গা এমন বাসাও অনেক সময় ব্যাচেলরদের জন্য ‘উপযুক্ত’ বলে বিবেচিত হয়। কখনো কখনো আপনার এমনও মনে হতে পারে যে, আপনার গ্রামের বাড়ির গোয়ালঘরটিও থাকার জন্য এর চেয়ে বেশি উপযোগী!
অবশ্য ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ব্যাচেলরদের জন্য স্বাভাবিক ও ভালো বাসাও ভাড়া দেওয়া হয়। কিন্তু সমস্যা হলো, ভালো বাসার ক্ষেত্রে ব্যাচেলরদের সুযোগ অনেক সময় সংকুচিত হয়ে যায়, আর সেই সংকটের সুযোগ নিয়ে কিছু বাড়িওয়ালা এত বেশি ভাড়া দাবি করেন যা মেটানো স্বল্প বেতনের চাকরিজীবী ব্যাচেলরদের পক্ষে সম্ভব নয়।
মেসে থাকাও কি সবসময় সমাধান?
অনেকে বাসা না পেলে মেসে থাকার পরামর্শ দিতে পারেন। কিন্তু সব ব্যাচেলর মেসে থাকতে চান না। একসঙ্গে কয়েকজন অপরিচিত মানুষের সঙ্গে থাকা সবার জন্য স্বস্তিকর নয়। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, জীবনযাপন, কাজের সময়, ঘুমের অভ্যাস—সবকিছুতেই সমস্যা হতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা, মেসে থাকা মানেই নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নয়।
আমার পরিচিত একজন তরুণের কথাই ধরা যাক। কয়েক বছর ধরে ঢাকায় চাকরি করছেন। মেসে থাকার অভিজ্ঞতা তার খুব একটা ভালো নয়। তার মোবাইল ফোন দুইবার চুরি হয়েছে। নিজের মতো একটি ছোট বাসা বা অন্তত একটি স্বাধীন রুমে থাকার চেষ্টা করেও দীর্ঘদিন ধরে সফল হতে পারেননি। কারণ বাসা খুঁজতে গিয়ে বারবার একই উত্তর, ‘ব্যাচেলর দেওয়া হবে না।’ এটি একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। কিন্তু এমন অভিজ্ঞতা যে আরও অনেকের আছে, তা বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদন ও অনলাইন আলোচনাতেও দেখা যায়।
তাহলে প্রশ্নটা থেকেই যায়, ব্যাচেলররা যাবে কোথায়? তাদেরও তো চাকরি করতে হবে। পড়াশোনা করতে হবে। ব্যবসা করতে হবে। নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। ঢাকায় এসে কাজ করা একজন অবিবাহিত মানুষের থাকার প্রয়োজনটা কোনোভাবেই একজন বিবাহিত মানুষের চেয়ে কম নয়।
আর এখানেই তৈরি হচ্ছে অন্য একটি সমস্যা
যখন কোনো মানুষ বারবার বাসা খুঁজে ব্যর্থ হন, তখন একসময় তার সামনে কয়েকটি পথ থাকে—মেসে থাকা, অস্বাস্থ্যকর বা অনুপযুক্ত বাসায় ওঠা, বেশি ভাড়া দেওয়া, অথবা পরিচয় গোপন বা পরিবর্তন করে বাসা নেওয়ার চেষ্টা করা।
এই বাস্তবতার দিকে তাকালে একটি প্রশ্ন সঙ্গতভাবেই উঠে আসে। ব্যাচেলরদের বাসা ভাড়া দিতে অনীহা কি কিছু মানুষকে স্বামী-স্ত্রীর ভুয়া পরিচয় দেওয়ার দিকে ঠেলে দিচ্ছে? একজন ব্যাচেলর যদি জানেন, ‘আমি ব্যাচেলর’ বললে বাসা পাওয়া কঠিন, কিন্তু ‘আমরা স্বামী-স্ত্রী’ বললে দরজা খুলে যেতে পারে, তাহলে এই বৈষম্য স্বাভাবিকভাবে তাকে মিথ্যা পরিচয় দিতে প্ররোচিত করবে।
কারণ মানুষকে যখন স্বাভাবিক পথে একটি প্রয়োজন মেটানোর সুযোগ দেওয়া হয় না, তখন কেউ কেউ অস্বাভাবিক পথ বেছে নেয়। অবশ্যই মিথ্যা পরিচয় দেওয়া সমর্থনযোগ্য নয়। কিন্তু মিথ্যার বিরুদ্ধে কথা বলার পাশাপাশি সেই পরিস্থিতির বিরুদ্ধেও কথা বলা দরকার, যে পরিস্থিতি মানুষকে মিথ্যা বলতে প্ররোচিত করেছে।
বাড়িওয়ালাদের এই ব্যাচেলরবিদ্বেষী মনোভাব এবং স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ের প্রতি তুলনামূলক বেশি আস্থার সুযোগ নিচ্ছে অসাধু মানুষও। কোথাও কোথাও স্বামী-স্ত্রীর পরিচয়ে বাসা ভাড়া নিয়ে অনৈতিক কর্মকাণ্ড, মাদকসংক্রান্ত অপরাধ কিংবা গুরুতর অপরাধ সংঘটিত হওয়ার খবর নিউজ পোর্টালগুলোতে বিভিন্ন সময় এসেছে। অর্থাৎ শুধু ‘ফ্যামিলি’ পরিচয় থাকলেই যে একটি বাসা বা ভবন নিরাপদ থাকবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। বাস্তবে একজন অবিবাহিত চাকরিজীবী যেমন দায়িত্বশীল ও শান্তিপূর্ণ ভাড়াটিয়া হতে পারেন, তেমনি স্বামী-স্ত্রীর পরিচয়ে থাকা ব্যক্তিরাও অপরাধে জড়িত হতে পারেন। তাই বৈবাহিক পরিচয়কে নিরাপত্তার প্রধান মাপকাঠি বানানো কতটুকু যৌক্তিক তা ভেবে দেখা উচিত।
বাড়িওয়ালাদের উদ্বেগও অমূলক নয়
এখানে বাড়িওয়ালাদের কথাও শুনতে হবে। একটি বাড়ি শুধু ইট-পাথরের কাঠামো নয়; সেখানে অন্য পরিবারও থাকে। বাড়িওয়ালা চান ভাড়াটিয়ারা নিয়ম মেনে চলুক, সময়মতো ভাড়া দিক, বাড়ির ক্ষতি না করুক, প্রতিবেশীদের বিরক্ত না করুক এবং নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি না করুক।
কোনো বাড়িওয়ালা যদি আগের অভিজ্ঞতা থেকে ব্যাচেলর ভাড়াটিয়া নিয়ে সমস্যায় পড়ে থাকেন, তার সতর্ক হওয়ার কারণ থাকতে পারে। কিন্তু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে একটি পুরো শ্রেণির মানুষকে সন্দেহের চোখে দেখা কি ন্যায্য?
একজন ব্যাচেলর যেমন খারাপ ভাড়াটিয়া হতে পারেন, তেমনি একটা পরিবারও খারাপ ভাড়াটিয়া হতে পারে। সুতরাং ভাড়াটিয়ার বৈবাহিক অবস্থা নয়, বরং তার আচরণ, পরিচয়, আর্থিক সক্ষমতা এবং চুক্তির প্রতি দায়বদ্ধ থাকার মানসিকতার মতো বিষয়গুলো মূল বিবেচ্য হওয়া উচিত।
ঢাকা মহানগর পুলিশের ভাড়াটিয়া নিবন্ধন ব্যবস্থা
ঢাকা মহানগর পুলিশের ভাড়াটিয়া নিবন্ধন ব্যবস্থায় বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়ার পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা রয়েছে। ভাড়াটিয়ার পরিচয়, যোগাযোগের তথ্য, স্থায়ী ঠিকানা, পেশা, জরুরি যোগাযোগ, বসবাসকারী ব্যক্তিদের তথ্য ইত্যাদি যাচাই করার ব্যবস্থা রয়েছে। এই তথ্য ফ্যামিলি বা ব্যাচেলর সব ধরণের ভাড়াটিয়ার কাছ থেকে নেওয়ার নিয়ম রয়েছে। এক্ষেত্রে একজন ফ্যামিলি ভাড়াটিয়াও চাইলে এসব তথ্যের বাইরে গিয়ে কোনো সমস্যাজনক আচরণ করতে পারেন। সুতরাং ‘ফ্যামিলি’ মানেই নিরাপদ এবং ‘ব্যাচেলর’ মানেই ঝুঁকিপূর্ণ এই সমীকরণ বাস্তবসম্মত নয়।
শেষ কথা
একজন মানুষ বিয়ে করেননি, এটি তার অপরাধ নয়। সে ছাত্র হতে পারে, চাকরিজীবী হতে পারে, উদ্যোক্তা হতে পারে, ফ্রিল্যান্সার হতে পারে, কিংবা নিজের মতো করে জীবনযাপন করা একজন সাধারণ মানুষ হতে পারে। তারও নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও সম্মানজনক একটি বাসায় থাকার অধিকার আছে। শেষ পর্যন্ত বাসা তো মানুষের থাকার জায়গা। সেখানে মানুষকে তার বৈবাহিক পরিচয় দিয়ে নয়, তার মানুষ হিসেবে দায়িত্ববোধ ও আচরণ দিয়ে বিচার করাই বোধহয় বেশি ন্যায়সংগত। কারণ শেষ পর্যন্ত নিরাপদ ভাড়াটিয়া মানেই বিবাহিত ভাড়াটিয়া নয়; আর ব্যাচেলর মানেই অনিরাপদ ভাড়াটিয়াও নয়।
