প্যারাসাইকোলজিঃ ব্যাখ্যাতীত ঘটনা নিয়ে চর্চা করে যে বিষয়
টেলিপ্যাথি, ভবিষ্যৎ জেনে যাওয়া বা স্বপ্নে দেখা, প্রেতাত্মা বা মৃত আত্মার দেখা পাওয়া, আউট-অব-বডি এক্সপেরিয়েন্স, নিয়ার ডেথ এক্সপেরিয়েন্স অর্থাৎ শরীরের বাইরে চেতনা অনুভব এবং মৃত্যুর কাছাকাছি অভিজ্ঞতা, পুনর্জন্ম—এ সবই প্যারাসাইকোলজির অন্যতম প্রধান অধ্যয়ন ক্ষেত্র।
শেকসপিয়ারের ‘হ্যামলেট’ নাটকের সেই বিখ্যাত সংলাপটি শুনেছেন নিশ্চয়ই—‘There are more things in heaven and earth, Horatio, than are dreamt of in your philosophy’। অনেক বিখ্যাত ভৌতিক বা প্যারানরমাল উপন্যাসের শুরুতে হ্যামলেট নাটকের এই বিখ্যাত সংলাপটি লেখা থাকে। এখানে হ্যামলেট তার বন্ধু হোরেশিওকে উদ্দেশ্য করে বলছে, ‘হোরেশিও, স্বর্গ ও পৃথিবীতে এমন আরও অনেক কিছু আছে, যা তোমার দর্শনে কল্পনাও করা হয়নি।’ অর্থাৎ প্রচলিত জ্ঞান এবং দর্শন যে ব্যাখ্যা দেয়, এই জগৎ আর আমাদের অভিজ্ঞতা তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল আর রহস্যময়। আর প্যারাসাইকোলোজি আমাদের অভিজ্ঞতার সেই জটিল আর রহস্যময় দিকগুলো নিয়েই আলোচনা করে।
প্যারাসাইকোলোজি অনেকের কাছে শুনতে নতুন মনে হলেও বাইরের অনেক দেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক আগে থেকেই এই বিষয়টি নিয়ে পড়ানো হয়। বিশ্বের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্যারাসাইকোলজি একটি গবেষণামূলক শাখা হিসেবে বিবেচিত। যুক্তরাজ্যের University of Edinburgh-এ প্যারাসাইকোলজি নিয়ে গবেষণা হয়। University of Virginia-তে ড. ইয়ান স্টিভেনসনের পূর্ণজন্ম ও চেতনা নিয়ে বিখ্যাত গবেষণা রয়েছে।
টেলিপ্যাথি, ভবিষ্যৎ ঘটনা আগে থেকেই জেনে যাওয়া বা স্বপ্নে দেখা (Precognition), মনের জোরে বস্তু স্থানান্তর বা সাইকোকাইনেসিস (Psychokinesis), প্রেতাত্মা বা মৃত আত্মার দেখা পাওয়া বা Apparitions, আউট-অব-বডি এক্সপেরিয়েন্স (OBE) এবং নিয়ার ডেথ এক্সপেরিয়েন্স (NDE) অর্থাৎ শরীরের বাইরে চেতনা অনুভব এবং মৃত্যুর কাছাকাছি অভিজ্ঞতা, পুনর্জন্ম বা পূর্ণজন্ম (Reincarnation)—এ সবই প্যারাসাইকোলজির অন্যতম প্রধান অধ্যয়ন ক্ষেত্র।
কিছু উদাহরণ দেয়া যাক।
উদাহরণ-১: দরজার আড়ালে
১৯৮৭ সালের এক সন্ধ্যায়, যুক্তরাজ্যের একটি ছোট্ট গ্রাম এলডিনব্রোকে—যা লন্ডন থেকে প্রায় ৬০ মাইল উত্তর-পূর্বে—মার্গারেট হেলউড নামে এক মা তার ৮ মাস বয়সী সন্তানকে খাবার খাওয়াচ্ছিলেন। বাড়ির পরিবেশ ছিল নিরিবিলি আর ঠান্ডা, বাইরে বাতাসে ঝিরঝিরে বৃষ্টির শব্দ। হঠাৎ তিনি দেখতে পেলেন, তার ছোট ভাই থমাস হেলউড তাকে দেখে দরজার আড়ালে লুকিয়ে পড়লেন। থমাস পেশায় একজন পাইলট। কাজ করতেন ব্রিটানিয়া এয়ারওয়েজে। একজন সিনিয়র ফ্লাইট ক্যাপ্টেন হিসেবে।
মার্গারেট প্রথমে খুবই অবাক হলেন। কারণ তার ভাইয়ের এই মুহূর্তে হাজার মাইল দূরে তার কর্মস্থলে থাকার কথা। প্রথমে অবাক হলেও পরে ভাবলেন, হয়তো থমাস তাকে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য বাড়িতে ঢুকে এমনটা করছে। কিন্তু পুরো বাড়ি খুঁজেও তিনি কোথাও থমাসকে খুঁজে পেলেন না। মাত্র কয়েক মিনিট পর টেলিফোন বেজে উঠলো। অপর প্রান্ত থেকে একজন কাঁপা গলায় জানালেন—থমাস হেলউড কিছুক্ষণ আগে ব্রিটানিয়া এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে কো-পাইলট হিসেবে ডিউটির সময় বিমান দুর্ঘটনায় মারা গেছেন।
মার্গারেট পরবর্তীতে জানান, ‘আমি নিশ্চিত আমি আমার ভাইকে দেখেছি। সেকেন্ড দুয়েকের জন্য হলেও। এমন ছিল যেন সে একবার এসে চোখের ইশারায় আমাকে বিদায় জানিয়ে গেল।’ প্যারাসাইকোলজিস্টরা এই ধরণের ঘটনাকে ‘Crisis Apparition’ হিসেবে নথিভুক্ত করেন। তাদের মতে, মৃত্যুর মুহূর্তে আত্মার উপস্থিতি কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রিয়জনের সামনে দৃশ্যমান হতে পারে—বিশেষ করে আবেগের গভীর সংযোগ থাকলে।
উদাহরণ-২: ছায়া উপত্যকায়
মাউন্ট কাজবেক। জর্জিয়ার উত্তর সীমান্তে একটি জনমানবহীন, রহস্যময় পর্বতশ্রেণী। এই পর্বতটি স্থানীয়দের কাছে পরিচিত ‘ছায়া উপত্যকা’ নামে। কারণ অতীতে এখানে অনেকে নিখোঁজ হয়েছে বা অনেকের মৃত্যু ঘটেছে। ২০১১ সালের গ্রীষ্মে তিন তরুণ অভিযাত্রী বন্ধু—রাশিদ করিমভ, দালের মুরাতভ, এবং নিজাত সাফারলি—মাউন্ট কাজবেক অভিযানে যায়। অভিযানের চতুর্থ দিনে খারাপ আবহাওয়া আর ঘন কুয়াশার মধ্যে নিজাত সাফারলি হঠাৎ পা হড়কে গভীর খাদে পড়ে যায়। বাকি দুই বন্ধু বহু চেষ্টা করেও নিজাতকে জীবিত অবস্থায় খুঁজে পায়নি। পরবর্তীতে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
কয়েক বছর পর নিজাতের দুই বন্ধু রাশিদ আর দালের এক ধরনের মানসিক শ্রদ্ধা জানানোর জন্য আবারও মাউন্ট কাজবেকে যায়। তারা নিজাতের মৃত্যুর ঘটনাস্থলে পৌঁছে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে। ঠিক তখনই, বিকেলের আলোয় কুয়াশার মধ্যে তারা একসাথে দেখতে পায়—দূরে, সেই একই খাদপথের কিনারায় নিজাত সাফারলি দাঁড়িয়ে আছে। নিজাত তাদের দিকে তাকিয়ে হাসছিলো। পরনে লাল জ্যাকেট যা সে পরেছিল মৃত্যুর দিন। দুই বন্ধুই স্তব্ধ হয়ে যায়। একজন বলার আগেই আরেকজন বলে ওঠে, ‘তুমি… নিজাত… দেখেছো?’ কিন্তু নিমিষেই সেই ছায়ামূর্তি মিলিয়ে যায় কুয়াশায়।
প্যারাসাইকোলজিস্টরা এই ধরণের ঘটনাকে Collective Crisis Apparition-এর উদাহরণ হিসেবে চিহ্নিত করেন। কারণ এই দৃষ্টিগোচরতা একসাথে দুইজন প্রত্যক্ষ করেছে, কল্পনা নয়—বরং সঠিক স্থান, সময় ও অবস্থায়। তাদের মতে, মৃত আত্মার স্থানিক স্মৃতি অথবা একধরনের মানসিক আবেগের দাগ প্রাকৃতিক পরিবেশে টিকে থাকতে পারে। দু’জন ব্যক্তি একযোগে যেটি দেখেন, তা কেবল কল্পনা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।
উদাহরণ-৩: শান্তি দেবী
১৯২৬ সালের ১১ ডিসেম্বর দিল্লিতে শান্তি দেবীর জন্ম। ছোটবেলা থেকেই তিনি বাবা-মাকে তার পূর্বজন্মের কথা বলতেন। স্কুলে গিয়ে অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে না খেলে বরং তাদেরকে তার আগের জন্মের স্বামীর গল্প শোনাতেন। এ সময় তাকে মথুরার আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলতেও শোনা যেতো। কৌতুহলীদের জোরাজুরিতে শান্তি দেবী একদিন তার স্বামীর নাম বলেন। স্বামীর নাম কেদারনাথ চৌবে। বাড়ি মথুরাতে। তিনি স্বামীর চেহারার বিস্তারিত বিবরণও দেন। এ-ও বলেন যে, তার আগের জন্মের নাম ছিল লুগ্দী দেবী। ১৯২৫ সালের অক্টোবরে একটি বাচ্চার জন্ম দেওয়ার ১০ দিনের মধ্যে মারা যান লুগ্দী দেবী। অতটুকু বাচ্চার মুখে এমন গল্প শুনে সবাই হতভম্ব হয়ে যায়।
এ ঘটনার পর পরই মথুরাতে শান্তি দেবীর স্বামী কেদারনাথ চৌবে’র খোঁজ শুরু হয়ে যায়। অবশেষে খুঁজে পাওয়া যায় তাকে। খোঁজ পাওয়ার পরই শান্তি দেবীর এক আত্মীয় কেদারনাথকে চিঠি লিখে বিস্তারিত সব ঘটনা জানান। চিঠির জবাবে কেদারনাথ বিস্ময়করভাবে জানান, শান্তি যা বলছে সব সত্যি!
এক আত্মীয়ের সঙ্গে দিল্লিতে গেলে শান্তি দেবী কেদারনাথের এক চাচাতো ভাইকে দেখামাত্রই চিনে ফেলেন। কেদারনাথ পরে ছেলে এবং তৃতীয় স্ত্রীর সঙ্গে দিল্লিতে এসে শান্তি দেবীর সঙ্গে দেখা করেন। শান্তি দেবীর কাছে তিনি নিজের পরিচয় দেন কেদারনাথের বড় ভাই বলে। কিন্তু শান্তি দেবী কেদারনাথের ছেলে নবনীতলালকে চিনে ফেলেন। কেদারনাথ একান্তে শান্তি দেবীর সঙ্গে কথা বলার পর সবাইকে জানান যে, শান্তিই লুগ্দী দেবী। কারণ শান্তি এমন কিছু কথা কেদারনাথকে বলেছিলেন যেগুলো লুগ্দী দেবী ছাড়া আর কেউ জানতেন না!
শান্তি দেবীকে নিয়ে দেশ জুড়ে চর্চা শুরু হলে তা মহাত্মা গান্ধীর কানেও পৌঁছায়। ঘটনার সত্যতা জানতে তিনি একটি কমিশন গঠন করে তদন্তের নির্দেশ দেন। ১৯৩৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর কমিশনের লোকজন শান্তি দেবীর সঙ্গে মথুরা যান। সেখানে শান্তি দেবীকে দেখতে ভিড় করে থাকা লোকজনের মধ্যে লুগ্দী দেবীর এক দাদু সহ অনেক আত্মীয়কে তিনি চিনতে পারেন। ১৯৩৬ সালে কমিশন তাদের রিপোর্ট পেশ করে জানায়, লুগ্দী দেবীই শান্তি দেবী নামে পুনর্জন্ম নিয়েছেন। যদিও সেই সময় আরও পৃথক দু’টি রিপোর্ট কমিশনের রিপোর্টকে খণ্ডন করার চেষ্টা করেছিল।
আজীবন অবিবাহিত থেকে গিয়েছিলেন শান্তি দেবী। জীবদ্দশায় অনেকবার এমনকি মৃত্যুর চার দিন আগেও তাকে তার পুনর্জন্মের গল্প শোনাতে হয়েছে দেখা করতে আসা লোকজনকে যারা তার পুনর্জন্মের গল্পের সত্যতা নিয়ে গবেষণা করছিলেন। ১৯৮৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর শান্তি দেবীর মৃত্যু হয়। কিন্তু তার পুনর্জন্মের গল্প আজও লোকমুখে চর্চিত।
উপরের উদাহরণগুলির মতো পৃথিবীতে আরও অজস্র ব্যাখ্যাতীত ঘটনা আছে যার ব্যাখ্যা প্রচলিত বিজ্ঞান দিতে না পারলেও এমন ঘটনাগুলোই প্যারাসাইকোলজির চর্চিত বিষয় বা অধ্যয়ন ক্ষেত্র।
প্যারাসাইকোলজিকে কি বিজ্ঞান সমর্থন করে?
সমস্যা হচ্ছে, আমরা সবসময়ই আমাদের বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারগুলির মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকেই সবকিছুর ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করি। তাছাড়া, কোন কিছু বিজ্ঞান হিসেবে মানতে হলে সেটাকে যুক্তিসঙ্গত, বারবার পরীক্ষায় একই ফলাফল দেওয়া এবং পর্যবেক্ষণযোগ্য হতে হবে। কিন্তু প্যারাসাইকোলজির ক্ষেত্রে তা সম্ভব নয়। তাই প্যারাসাইকোলজি এখনও মূলধারার বিজ্ঞান শিক্ষার অংশ হয়ে উঠতে পারেনি; বরং এটিকে বিকল্প ও আন্তঃশৃঙ্খলাভিত্তিক গবেষণার অংশ হিসেবে দেখা হয়। তবে এর মানে এই নয় যে বিষয়টা পুরোপুরি অস্বীকার করে দেওয়া যায়। প্রতিনিয়ত মানুষ এমন সব ঘটনা বা অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয় যেগুলোকে শুধু মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যায় ফেলা যায় না। একসময় এমন অনেক কিছুই তো ছিল যা প্রথমে অবৈজ্ঞানিক মনে হলেও পরে তা বিজ্ঞান দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে।
তবুও প্যারাসাইকোলজি আমাদের জীবনে ঘটে যাওয়া ব্যাখ্যাহীন ঘটনা বা অভিজ্ঞতাগুলোর ব্যাখ্যা খোঁজার চেষ্টা করে। মানুষের মনের শক্তি এবং বাস্তবতার বাইরের সম্ভাবনা সম্পর্কে আমাদের জানার আগ্রহ কখনোই শেষ হবে না। প্যারাসাইকোলজি এমন একটি ক্ষেত্র যা আমাদের যুক্তিনির্ভর চেনা জগৎকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এখানে না আছে পূর্ণ প্রমাণ, না আছে পুরো অস্বীকারের সুযোগ। বাস্তবতা, অনুভব, বিজ্ঞান ও চেতনার সীমানায় দাঁড়িয়ে প্যারাসাইকোলজি আমাদের প্রশ্ন করে—সবকিছু কি সত্যিই আমরা বুঝে ফেলেছি?
