হিটলারের ডায়েরি: সংবাদমাধ্যমের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্রতারণা

জার্মান সাময়িকী ‘স্টার্ন’ ও ব্রিটিশ পত্রিকা ‘দ্য সানডে টাইমস’ ঘোষণা করল—তারা পেয়ে গেছে অ্যাডলফ হিটলারের গোপন ডায়েরি! বলা হলো, এটি শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক আবিষ্কার!

অ্যাডলফ হিটলার কারো চোখে ছিলেন ভয়ঙ্কর ত্রাস, আর কারো চোখে মহানায়ক | ছবি: সংগৃহীত

এমন একটা ঘটনা যা ইতিহাস বদলে দিতে পারতো—কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটা হয়ে দাঁড়াল এক বিশাল প্রতারণা। একটা খবর যা প্রথমে সবার কাছে বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হয়েছিল, কিন্তু পরে জানা গেল সবটাই ছিল এক নাটকীয় প্রতারণা! তেমনই এক ঘটনা ঘটেছিল ১৯৮৩ সালে। দাবি করা হয়েছিল, খুঁজে পাওয়া গেছে অ্যাডলফ হিটলারের ব্যক্তিগত হাতে লেখা ডায়েরি। জার্মান সাময়িকী ‘স্টার্ন’ ও ব্রিটিশ পত্রিকা ‘দ্য সানডে টাইমস’ ঘোষণা করল—তারা পেয়ে গেছে অ্যাডলফ হিটলারের গোপন ডায়েরি! হ্যাঁ, সেই হিটলার—নাৎসি জার্মানির একচ্ছত্র শাসক, যার নাম উচ্চারণ করলেও মানুষ থমকে যায়। বলা হলো, এটি শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক আবিষ্কার!

সেই চাঞ্চল্যকর এপ্রিল

২৫ এপ্রিল, ১৯৮৩। জার্মানির নামকরা সাপ্তাহিক পত্রিকা স্টার্ন ঘোষণা দিল তারা আবিষ্কার করেছে শতাব্দীর সবচেয়ে চমকপ্রদ ঐতিহাসিক দলিল: অ্যাডলফ হিটলারের ব্যক্তিগত ডায়েরি! লেখা হয়েছে ১৯৩২ থেকে ১৯৪৫ পর্যন্ত—মানে পুরো নাৎসি শাসনকাল জুড়ে। সঙ্গে সঙ্গে হামবুর্গে এক সংবাদ সম্মেলন ডাকা হয়। বলা হয়, এই ডায়েরিগুলো হিটলারের হাতের লেখা। বাইরের মলাটে স্বস্তিকা চিহ্ন, ঈগলের প্রতীক, ভিতরে পাতলা গোথিক হস্তাক্ষরে লেখা ডায়েরি, চিত্রাঙ্কন, পার্টি কার্ড, এমনকি তাঁর আঁকা ছবি পর্যন্ত।

এই ডায়েরি এলো কোথা থেকে?

স্টার্ন পত্রিকার সাংবাদিক গার্ড হেইডম্যান, যিনি আগে থেকেই নাৎসি স্মারক সংগ্রহে আগ্রহী ছিলেন। ১৯৭৩ সালে তাঁকে হিটলারের ডেপুটি হারম্যান গোরিংয়ের একটি পুরনো নৌযান নিয়ে প্রতিবেদন তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি সেটি কিনে ফেলে সংস্কারও করেন। পরবর্তীতে গোরিংয়ের মেয়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং সেই সূত্রে তিনি যোগাযোগ পান একদল সাবেক নাৎসির সঙ্গে। গার্ড হেইডম্যান দাবি করেন, তিনি একজন সংগ্রাহকের মাধ্যমে ডায়েরিগুলো সংগ্রহ করেছেন। কাহিনিটা ছিল সিনেমার চিত্রনাট্যের মতো—একটি বিমান বিধ্বস্ত হয়, সেখান থেকে উদ্ধার হয় ডায়েরিগুলো, পরে তা পূর্ব জার্মানির এক সংগ্রাহকের কাছে যায়। ডায়েরিগুলোর সত্যতা যাচাই করতে পাঠানো হয় ইতিহাসবিদ হিউ ট্রেভর রোপার, যিনি তখন হিটলার বিশেষজ্ঞ হিসেবে খ্যাত। প্রথমে তিনি সন্দিহান থাকলেও পরে বলেন, ‘এগুলো আসল’—আর এই ঘোষণাই গোটা ঘটনাটাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। তখন স্টার্ন কর্তৃপক্ষ ৯৩ লাখ ডয়েচমার্ক দিয়ে কিনে ফেলে ডায়েরির মালিকানা।

ডায়েরিতে কী ছিল?

ডায়েরিগুলোর ভিতরের লেখাগুলো আরও চমকে দেওয়ার মতো। সেগুলোর ভাষা ছিল এমন, যেন হিটলারের নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা, দৈনন্দিন অস্বস্তি, সম্পর্ক, পলিটিক্যাল ডিলেমা সব উঠে এসেছে। ডায়েরিতে বলা হয়েছিল—হিটলার নাকি মুখের দুর্গন্ধ ও পেট ফাঁপার সমস্যায় অস্বস্তি বোধ করতেন। বান্ধবী ইভা ব্রাউন অলিম্পিকের টিকিট চেয়ে বিরক্ত করতেন। স্তালিনকে জন্মদিনে ‘দ্য ওল্ড ফক্স’ লিখে শুভেচ্ছা পাঠাতেন হিটলার! এমনকি এমন ধারণাও পাওয়া যায় যে, হিটলার হলোকাস্ট সম্পর্কে পুরোপুরি জানতেন না! এসব তথ্য মানে—এই ডায়েরিগুলো হিটলারের ব্যাপারে পূর্বে প্রচলিত ইতিহাসকেই পাল্টে দিতে পারে!

একেবারেই নিশ্চিত!

স্টার্নের লন্ডন সম্পাদক পিটার উইকম্যান বিবিসিকে বলেছিলেন, “আমরা একেবারেই নিশ্চিত, এগুলো আসল।”
তিনি বলেন, “আমরা হস্তাক্ষর বিশেষজ্ঞ, কাগজ বিশ্লেষক এবং এমনকি হিউ ট্রেভর রোপারের মতো খ্যাতিমান ইতিহাসবিদদের দেখিয়েছি। সবাই একমত হয়েছেন।” ইতিহাসবিদ লর্ড ড্যাক্রে প্রথমে সন্দেহ করলেও, পরে ডায়েরিগুলোর বিশালতা দেখে মুগ্ধ হয়ে যান। তিনি বলেছিলেন, “এটা বিশাল এক আর্কাইভ, শুধু ডায়েরিই নয়—আঁকা ছবি, পার্টির কার্ড, এমনকি কিছু চিত্রকর্ম যা হিটলার আর্ট স্কুলে ভর্তি হওয়ার সময় জমা দিয়েছিলেন।”

সন্দেহ জমতে শুরু করে

কিন্তু খুব দ্রুতই এই ঐতিহাসিক আবিষ্কারে ফাটল দেখা দেয়। ‘দ্য সানডে টাইমস’-এর সম্পাদক ফ্রাঙ্ক জাইলস ইতিহাসবিদ ট্রেভর-রোপারের সঙ্গে কথা বলেন, যিনি তখন স্বীকার করেন—তিনি এখন সন্দেহ করছেন। সেখানে উপস্থিত সবাই হতবাক হয়ে যান। এতদিন যাঁকে প্রধান প্রমাণ হিসেবে ধরা হচ্ছিল, তিনিই এখন বলেন, “আমার বিশ্বাস ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গেছে।” কিন্তু মালিক রুপার্ট মারডক বলেন—“আমরা এটা ছাপাবই!”

ভুয়া ডায়েরির প্রতারণা ফাঁস

অটোগ্রাফ বিশেষজ্ঞ চার্লস হ্যামিল্টন বিবিসিকে বলেন, “এই স্বাক্ষরগুলো হিটলারের নয়। আমি অনেক ভুয়া নথিপত্র দেখেছি। এটা জাল।” রাসায়নিক পরীক্ষায় দেখা যায়, কাগজ, কালি ও আঠা—সবই তৈরি হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর। ডায়েরির ভাষায় ছিল আধুনিক রচনাশৈলী, ছিল ঐতিহাসিক অসংগতি।

কে ছিল এই প্রতারণা পেছনে?

গোটা প্রতারণার মূল পরিকল্পনাকারী ছিল একজন শিল্পী ও প্রতারক—কনরাড কুজাউ। তিনি চা ঢেলে কাগজ পুরোনো করার চেষ্টা করেছিলেন। এমনকি ডায়েরির মলাটে হিটলারের আদ্যক্ষর ‘AH’ না লিখে ভুল করে লিখেছিলেন ‘FH’! তাঁর দক্ষতা ছিল সত্যি চমকপ্রদ, কিন্তু ভুলগুলোও ছিল বেশ চোখে পড়ার মতো। স্টার্নের সাংবাদিক হেইডম্যান বলেন, “আমি প্রতারিত হয়েছি।” কিন্তু কুজাউ বলেন, “না, হেইডম্যান জানতেন সব কিছু।” ১৯৮৫ সালে কুজাউ পান সাড়ে চার বছরের কারাদণ্ড। হেইডম্যানকেও দোষী সাব্যস্ত করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ২০১১ সালে বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের Witness History অনুষ্ঠানে, ‘সানডে টাইমসের অনুসন্ধানী’ দলের ফিলিপ নাইটলি জানান, ওই ভুয়া ডায়েরিগুলোর লেখক ছিলেন মিলান শহরের বাইরে ভার্সেলিতে বসবাসকারী দুই নারী।

শেষ পর্যন্ত কে কী পেল?

এই ঘটনার সবচেয়ে করুণ দিক হলো, যারা সত্য প্রতিষ্ঠায় বিশ্বাস করতেন—তাঁদের সুনাম ধ্বংস হয়। লর্ড ড্যাক্রে, যিনি ডায়েরিগুলো ‘আসল’ বলে ঘোষণা করেছিলেন, তাঁর ঐতিহাসিক মর্যাদা পড়ে যায় প্রশ্নবিদ্ধতায়। স্টার্নের সম্পাদক পিটার কোচ আর সানডে টাইমসের সম্পাদক জাইলস—দুজনেই চাকরি হারান। আর রুপার্ট মারডক? তাঁর পত্রিকার সার্কুলেশন বেড়ে যায়! চুক্তির শর্তানুযায়ী স্টার্নকে অর্থ ফেরত দিতে হয়। ফলে কেলেঙ্কারির মধ্যেও তিনিই একমাত্র আর্থিকভাবে লাভবান হন। ২০১২ সালে এক তদন্তে মারডক নিজেই বলেন, “আমি একটা বিশাল ভুল করেছিলাম। এটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অনুতাপ।”

এ সম্পর্কিত আরও