মে দিবস এখনও কি শুধু কাজ, ক্লান্তি, স্বপ্নভঙ্গ আর নীরবতার গল্প?
আজও কত মানুষ দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, কম বেতন আর নীরব মানসিক চাপের মধ্যে দিন কাটায়। দিনের পর দিন উদয়াস্ত কাজ করে জীবন হয়ে ওঠে একঘেয়ে আর বৈচিত্রহীন। মনের বিরুদ্ধে আর দিনের পর দিন অন্যের হয়ে কাজ করতে গিয়ে একসময় তারা হারিয়ে ফেলে নিজেকেই।
মে দিবস। শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের ইতিহাসে এই দিনটি শুধু একটি উদযাপনের জন্য নয়—এটি সংগ্রামের প্রতীক, ত্যাগের প্রতীক, অধিকার আদায়ের প্রতীক। ১৮৮৬ সালের শিকাগোতে শ্রমিকরা যখন “আট ঘণ্টা কাজ, আট ঘণ্টা বিশ্রাম, আট ঘণ্টা নিজের জন্য”—এই দাবিতে রাস্তায় নেমেছিল, তখন তাদের কণ্ঠরোধ করতে গুলি চালানো হয়েছিল। সেই রক্তের ওপর দাঁড়িয়েই আজকের মে দিবস।
নোবেলজয়ী মার্কিন সাহিত্যিক উইলিয়াম ফকনারের একটি উক্তি এই দিনে বারবার মনে পড়ে—
“সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপারগুলোর একটি হচ্ছে—একজন মানুষ আট ঘণ্টা ধরে খেতে পারে না, আট ঘণ্টা ধরে মদ্যপান করতে পারে না, এমনকি আট ঘণ্টা ধরে ভালোও বাসতে পারে না। অথচ সে আট ঘণ্টা ধরে দিনের পর দিন শুধুমাত্র একটাই কিছু করতে পারে, আর তা হলো—কাজ।”
ফকনারের কাছে বিষয়টি ছিল বিস্ময়ের। কিন্তু তিনি যদি বাংলাদেশের প্রাইভেট চাকরিজীবীদের বাস্তবতা দেখতেন, তাহলে হয়তো বিস্ময়ের জায়গায় হতবাক হয়ে যেতেন। কারণ এখানে “আট ঘণ্টা কাজ” কোনো নিয়ম নয়—এটি বরং অনেকের জন্য একটি অধরা সৌভাগ্য।
এই দেশে প্রাইভেট কোম্পানিগুলোতে সময়মতো অফিসে ঢোকা বাধ্যতামূলক, কিন্তু সময়মতো বের হওয়া প্রায় অসম্ভব। নির্দিষ্ট সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বের হলে বসের চোখ রাঙানি, বিরাগভাজন হওয়ার ভয়, এমনকি চাকরি হারানোর শঙ্কা—সবই যেন এক অদৃশ্য শৃঙ্খল। এখানে কাজের কোনো নির্দিষ্ট শেষ নেই—উদয়াস্ত পরিশ্রম, অযৌক্তিক চাপ, এবং কখনো কখনো অপমান।
সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপারগুলোর একটি হচ্ছে—একজন মানুষ আট ঘণ্টা ধরে খেতে পারে না, আট ঘণ্টা ধরে মদ্যপান করতে পারে না, এমনকি আট ঘণ্টা ধরে ভালোও বাসতে পারে না। অথচ সে আট ঘণ্টা ধরে দিনের পর দিন শুধুমাত্র একটাই কিছু করতে পারে, আর তা হলো—কাজ।
—উইলিয়াম ফকনার, নোবেলজয়ী মার্কিন সাহিত্যিক
আরেকটি তিক্ত বাস্তবতা হলো, অনেক ক্ষেত্রেই উচ্চশিক্ষিত তরুণদের কাজ করতে হয় এমন মালিকের অধীনে, যাদের শিক্ষাগত বা নৈতিক যোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ। অর্থ আছে, ক্ষমতা আছে; কিন্তু কর্মীদের প্রতি সম্মান নেই। গালিগালাজ, অপমান, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে শারীরিক নির্যাতনের ঘটনাও অস্বাভাবিক নয়। কর্মক্ষেত্র হয়ে ওঠে এক ধরনের মানসিক নির্যাতনকেন্দ্র।
এখানে বেতন কম, বাড়ে ধীরে। প্রমোশন অনিশ্চিত। ওভারটাইমের হিসাব নেই। ছুটির অধিকার কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে তা প্রায়ই অনুপস্থিত। চাকরির নিরাপত্তা নেই, যেন দড়ির ওপর দিয়ে হাঁটা। কাজ করতে গিয়ে একটি ভুল করা, একটি ভুল সিদ্ধান্ত, আর তাতেই শেষ হয়ে যেতে পারে বছরের পর বছর গড়ে তোলা ক্যারিয়ার।
তরুণদের স্বপ্নভঙ্গের আরেকটি বড় কারণ—শিক্ষা ও পেশার অমিল। যে তরুণ পদার্থবিদ্যা, দর্শন বা সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করে, তাকে শেষ পর্যন্ত এমন একটি চাকরিতে ঢুকতে হয় যেখানে তার শিক্ষার কোনো মূল্য নেই। স্বপ্ন ধীরে ধীরে বাস্তবতার চাপে ভেঙে পড়ে। প্রতিদিন মনের বিরুদ্ধে গিয়ে কাজ করতে করতে একসময় তারা নিজেকেই হারিয়ে ফেলে।
একঘেয়ে, বৈচিত্রহীন, চাপে ভরা এই জীবন মানুষকে শুধু ক্লান্তই করে না; তাকে ভেতর থেকে ভেঙেও দেয়। অনেকেই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, অথচ বাইরে থেকে সবকিছু “স্বাভাবিক” দেখাতে হয়।
তারপরও মে দিবস আসে। উদযাপন হয়। ব্যানার ওঠে, বক্তৃতা হয়, ছুটি ঘোষণা হয়। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, সেই ১৮৮৬ সালের দাবিগুলো কি সত্যিই পূরণ হয়েছে?
তবুও, এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—অধিকার কেউ দেয় না, আদায় করে নিতে হয়। এবং প্রতিটি শ্রমিকের সম্মান, ন্যায্য মজুরি ও মানবিক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা শুধু একটি দাবি নয়, এটি একটি মৌলিক অধিকার।
মে দিবসে আত্মাহুতি দেওয়া সেই সব শ্রমিকদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।
আর যারা আজও নীরবে লড়াই করে যাচ্ছেন তাদের জন্য রইলো সংহতি।
ভালো থাকুক সব কর্মজীবী মানুষ। ভালো থাকুক সবাই।
