বাংলাদেশে পুরুষ নির্যাতন: আইন প্রণয়নের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট

পুরুষের চেয়ে নারী বেশি নির্যাতিত হয়—সমাজে এই ধারণাটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো পুরুষদের প্রকাশ না করার মানসিকতা। একজন নারী নির্যাতিত হলে অবলীলায় পরিবার, সমাজ বা আইনের দ্বারস্থ হতে পারেন এবং সমাজ তাকে সহানুভূতি দেখায়।

পুরুষ নির্যাতন প্রতিরোধে আইন প্রণয়নের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট হয়েছে | ছবি: এআই/আজপোস্ট

করোনাভাইরাস মহামারির লকডাউন চলাকালীন সময়ে পারিবারিক সহিংসতা বৃদ্ধি পাওয়ায়, ২০২০ সালের ২২ এপ্রিল জার্মানির বাভারিয়া এবং নর্থ রাইন-ওয়েস্টফালিয়া রাজ্য যৌথভাবে পুরুষদের ওপর হওয়া পারিবারিক ও সামাজিক সহিংসতা রোধে একটি বিশেষ ‘ডেডিকেটেড হেল্পলাইন’ চালু করে। পরবর্তীতে ২০২১ সালের এপ্রিল মাসে এর প্রথম বর্ষপূর্তিতে এক বছরের সংগৃহীত ডেটা ও অভিযোগের একটি অভাবনীয় পরিসংখ্যান আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।

দেখা যায়, হেল্পলাইনটি চালুর প্রথম বছরই সেখানে ১,৮২৫টিরও বেশি অভিযোগ আসে। ফোন করা পুরুষদের মধ্যে ৮৫% তীব্র মানসিক নির্যাতনের এবং ৫৩% সরাসরি শারীরিক নির্যাতনের কথা জানান। জার্মানির সমাজবিজ্ঞানীরা দেখেছিলেন, এতদিন লোকলজ্জার ভয়ে যে পুরুষরা চুপ ছিলেন, একটি নিরাপদ ও গোপন মাধ্যম পাওয়ার পর তারা নিজেদের ওপর হওয়া অত্যাচারের কথা অকপটে স্বীকার করতে শুরু করেছেন।

বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে পারিবারিক সহিংসতা ও নির্যাতনকে কেবল একপক্ষীয় বা নারী-কেন্দ্রিক সমস্যা হিসেবে দেখার একটি প্রবণতা রয়েছে। তবে সময়ের সাথে সাথে এই চেনা বাস্তবতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা আরেকটি অন্ধকার দিক ক্রমশ সামনে আসছে—তা হলো পুরুষ নির্যাতন। এমন প্রেক্ষাপটে, দেশের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমগুলোতে পুরুষ নির্যাতন প্রতিরোধে আইন প্রণয়নের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিটের খবরটি আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

রিটের প্রেক্ষাপট ও আইনি ভারসাম্যহীনতা

মঙ্গলবার (২১ জুলাই) সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী কাজী ইলিয়াসুর রহমান এবং বাটারফ্লাই হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে এই রিটটি দায়ের করা হয়। রিটের মূল বক্তব্য হলো—সংবিধানে সব নাগরিকের সমঅধিকারের কথা বলা থাকলেও বাংলাদেশে নারীদের সুরক্ষায় একাধিক কঠোর আইন রয়েছে, কিন্তু নির্যাতিত পুরুষদের আইনি প্রতিকারের কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা নেই। উল্টো অনেক ক্ষেত্রে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’ কিংবা ‘যৌতুক নিরোধ আইন’-এর অপব্যবহার করে পুরুষ ও তাদের পরিবারকে মিথ্যা মামলায় হয়রানি করার অভিযোগ রয়েছে। এই আইনি শূন্যতা পূরণের জন্যই একটি “ভারসাম্যমূলক আইন” (Balanced Law) প্রণয়নের দাবি জানানো হয়েছে।

আড়ালে থাকা সত্য

সমাজে সাধারণত ভাবা হয় পুরুষরাই সবসময় শোষক এবং নারীরাই একমাত্র ভুক্তভোগী। কিন্তু বাস্তবে চিত্রটি সব সময় এমন নয়। নারীরা যেভাবে শারীরিক ও সামাজিকভাবে সহিংসতার শিকার হন, ঠিক তেমনি বহু পুরুষও প্রতিনিয়ত নির্যাতনের মুখোমুখি হচ্ছেন। এই নির্যাতনের ধরনগুলো প্রায়শই সূক্ষ্ম ও মনস্তাত্ত্বিক। বিয়ের আগে সম্পর্কের নামে আর্থিক শোষণ, বিয়ের ভুয়া প্রতিশ্রুতি দিয়ে পরবর্তীতে ব্লাকমেইল বা মিথ্যা মামলার ভয় দেখিয়ে হেনস্থা করার ঘটনা এখন প্রতিদিনকার ঘটনা। আর বিয়ের পর পুরুষদের ওপর তীব্র মানসিক চাপ সৃষ্টি, সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার হুমকি, আর কথায় কথায় মিথ্যা আইনি মামলার ভয় দেখানো চরম মানসিক নির্যাতনের শামিল।

সামাজিক ট্যাবুর দেয়াল

পুরুষের চেয়ে নারী বেশি নির্যাতিত হয়—সমাজে এই ধারণাটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো পুরুষদের প্রকাশ না করার মানসিকতা। একজন নারী নির্যাতিত হলে তিনি অবলীলায় পরিবার, সমাজ বা আইনের দ্বারস্থ হতে পারেন এবং সমাজ তাকে সহানুভূতি দেখায়। কিন্তু একজন পুরুষ যখন মানসিক বা শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন, তখন তিনি সহজে কাউকে তা বলতে পারেন না। পিতৃতান্ত্রিক সামাজিক কাঠামোর কারণে পুরুষ মনে করেন, নিজের ওপর হওয়া নির্যাতনের কথা প্রকাশ করলে সমাজ তাকে ‘দুর্বল’ বা ‘কাপুরুষ’ ভাববে। এই লোকলজ্জা, উপহাসের ভয় এবং পুরুষসুলভ অহংকার বজায় রাখার তাগিদে পুরুষ মুখ বুজে অত্যাচার সহ্য করে যান। ফলে তাদের দীর্ঘশ্বাস চার দেয়ালের বাইরে আসে না এবং পরিসংখ্যানেও তা প্রতিফলিত হয় না।

প্রয়োজন Gender-neutral আইনি দৃষ্টিভঙ্গি

হাইকোর্টে দায়ের করা এই রিটটি বাংলাদেশের আইনি ও সামাজিক ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মোড়। এটি প্রমাণ করে যে, সমাজে প্রকৃত সমতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে কেবল এক লিঙ্গের সুরক্ষা দিলেই চলবে না, বরং অপরাধীকে অপরাধী এবং ভুক্তভোগীকে ভুক্তভোগী হিসেবেই দেখতে হবে।আইনের অপব্যবহার রোধ এবং বিয়ের আগে ও পরে মানসিক ও আইনি নির্যাতনের শিকার হওয়া পুরুষদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ‘পুরুষ নির্যাতন দমন ও প্রতিরোধ আইন’ সময়ের দাবি। রাষ্ট্র ও আদালতের উচিত এই নীরব সামাজিক ব্যাধিটিকে স্বীকৃতি দিয়ে একটি লিঙ্গ-নিরপেক্ষ (Gender-neutral) আইনি কাঠামো গড়ে তোলা।

এ সম্পর্কিত আরও