শেয়াল আমাদের এলাকায়, নাকি আমরাই তাদের এলাকায় ঢুকে পড়েছি?
শেয়ালের ডাক শুনে প্রশ্ন করলেন, ‘এখানে শেয়াল এলো কোত্থেকে?’ উত্তরটা হচ্ছে—শেয়াল আপনার এলাকায় ঢোকেনি, বরং আপনিই শেয়ালের এলাকায় ঢুকে পড়েছেন। আমরাই বরং তাদের জায়গা দখল করেছি। অথচ সব প্রাণীর সমান অধিকার রয়েছে এই পৃথিবীতে।
মানুষের স্বভাব হচ্ছে, নিজেকে কেন্দ্র করে পৃথিবীটাকে বিচার করা। তাই শেয়ালের ডাক শুনে আমরা অবাক হয়ে প্রশ্ন করি, ‘এখানে শেয়াল এলো কোত্থেকে?’ এই প্রশ্নের উত্তর হওয়া উচিত, শেয়াল আমাদের এলাকায় আসেনি, আমরাই বরং তার এলাকায় ঢুকে পড়েছি।
এই পৃথিবীটা শুধু মানুষের নয়, এই সাধারণ সত্যটা আমরা খুব সহজেই ভুলে যাই। আমরা বাড়ি বানাই, রাস্তা বানাই, শহর বানাই, তারপর ভাবি, এই জায়গাগুলো সব আমাদেরই। অথচ এই মাটি, এই গাছ, এই জঙ্গল সব কিছুর ওপর সমান অধিকার ছিল আরও অনেক প্রাণীর। আমরা শুধু তাদের জায়গা একটু একটু করে সরিয়ে দিয়েছি, চুপচাপ।
একসময় আমার বাসার আশেপাশে ছিল অনেক কিছুর এক অদ্ভুত সহাবস্থান। অল্প কিছু দূরেই মসজিদ, মন্দির, গির্জা, ক্যান্টনমেন্ট আর চিড়িয়াখানা। তার সাথে ছিল গাছপালা আর ছোট ছোট জঙ্গল। রাত গভীর হলে শেয়ালের ডাক ভেসে আসতো, একটা রহস্যময়, খানিকটা বিষন্ন সুর। পূজার সময় ঢাকের শব্দে রাত জেগে থাকতাম। খুব ভোর বেলা গির্জা থেকে গুরুগম্ভীর ঘন্টা বাজার শব্দ ভেসে আসতো। ঢং ঢং। শহরের ঘুম ভাঙাতো। ফজরের আজানের পর ক্যান্টনমেন্ট থেকে ভেসে আসতো বিউগলের সুর। নরম, শৃঙ্খলাবদ্ধ, অদ্ভুত সুন্দর। আর গভীর রাতে, খুব মনোযোগ দিয়ে শুনলে, চিড়িয়াখানা থেকে সিংহের গর্জনও শোনা যেতো।
শহরটা তখন শব্দে ভরা ছিল। কিন্তু সেই শব্দগুলো ছিল জীবনের, বৈচিত্র্যের, সহাবস্থানের।
এখন চারপাশে শুধু উঁচু উঁচু ভবন। ইমারতের জঙ্গল। মানুষ বেড়েছে, বিল্ডিং বেড়েছে। কিন্তু কমে গেছে শব্দের বৈচিত্র্য। গাছপালা নেই, জঙ্গল নেই, খোলা জায়গা নেই। শেয়ালের ডাক নেই, ঢাকের শব্দ নেই, গির্জার ঘণ্টা নেই, বিউগলের সুরও নেই।
শহর এখন শব্দহীন না, বরং একঘেয়ে শব্দে ভরা। চারপাশে সারাক্ষণ কিছু না কিছু বাজছেই। গাড়ির হর্ন, ইঞ্জিনের গর্জন, মানুষের তাড়াহুড়া, অবিরাম কথাবার্তা। যেন শহরটা সারাক্ষণ কথা বলছে, কিন্তু কিছুই বলছে না। সব মিলিয়ে এক ধরনের নিরবচ্ছিন্ন কোলাহল। এত শব্দ, অথচ সেই শব্দে প্রাণ নেই। সেখানে নেই কোনো গল্প, নেই কোনো বৈচিত্র্য। শুধু আছে একঘেয়ে যান্ত্রিকতা। এগুলো কানে লাগে, কিন্তু মনে পৌঁছায় না। কোনো স্মৃতি তৈরি করে না।
মাঝে মাঝে কোনো এক নির্জন রাতে, দূরে কোথাও শেয়াল ডেকে ওঠে। শুনে অদ্ভুত লাগে। চেনা অথচ অচেনা। মনে হয় যেন কেউ কাঁদছে। আর ঠিক তখনই, নিজের অজান্তে প্রশ্নটা ফিরে আসে, ‘এখানে শেয়াল এলো কোত্থেকে?’
